চীনে আপনার সেরা স্কলারশিপ, সেরা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেরা রিসার্চ সুপারভাইজার থাকতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই একাকীত্ব রোধ করতে পারে না। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হলো প্রথম বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ এবং এর সাথে আপনার একাডেমিক প্রোগ্রামের মানের কোনো সম্পর্ক নেই।
একটি ভিনদেশে যেখানে আপনি সেখানকার মূল ভাষা জানেন না, সেখানে সামাজিক জীবন গড়ে তোলা একটি সচেতন প্রচেষ্টার বিষয়। এটি নিজে নিজে ঘটে না। এই গাইডটিতে বন্ধু খুঁজে পাওয়া, একটি কমিউনিটি তৈরি করা এবং চীনে আপনার সময়কে সত্যিকারের উপভোগ করার বাস্তবসম্মত উপায়গুলো আলোচনা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সামাজিক পরিস্থিতি
এখানে আসল চিত্রটি তুলে ধরা হলো। বেশিরভাগ চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের থেকে কিছুটা আলাদা জগতে থাকে:
- আপনি প্রায়ই একটি আলাদা ডরমিটরি ভবনে থাকেন।
- আপনি কিছু বা সব ক্লাস আলাদাভাবে করেন (বিশেষ করে চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রিপারেশন বছরের সময়)।
- সামাজিক রীতিনীতি এবং কথা বলার ধরণ আলাদা হয়।
- ভাষা উভয় দিক থেকেই একটি বাধা।
এর মানে এই নয় যে দুই পক্ষের মধ্যে বন্ধুত্ব অসম্ভব। এটি সব সময়ই ঘটছে। তবে এর জন্য উভয় পক্ষ থেকেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়।
আপনার সামাজিক সার্কেলে সাধারণত তিনটি গ্রুপ থাকবে:
১. অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী: আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুত্ব করা সবচেয়ে সহজ কারণ আপনারা একই ধরণের নতুন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। ২. চীনা শিক্ষার্থী: যারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে কৌতূহলী, যারা ইংরেজি পড়ে অথবা যারা আপনার বিভাগের শিক্ষার্থী। ৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের মানুষ: যাদের সাথে আপনি ক্লাব, খেলাধুলা, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচিত হতে পারেন।
মানুষের সাথে কোথায় পরিচিত হবেন
বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব এবং ছাত্র সংগঠন
চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাব পদ্ধতি (社团) অত্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় প্রতিটি বিষয়ের জন্যই একটি ক্লাব রয়েছে: বাস্কেটবল, বিতর্ক, ফটোগ্রাফি, ক্যালিগ্রাফি, মার্শাল আর্ট, নাচ, দাবা, অ্যানিমে, রান্না, হাইকিং, স্বেচ্ছাসেবী কাজ এবং আরও অনেক কিছু।
যোগদানের নিয়ম: বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সেমিস্টারের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে “ক্লাব ফেয়ার” (百团大战, যার আক্ষরিক অর্থ ‘শত ক্লাবের যুদ্ধ’) আয়োজন করে। সেখানে ঘুরে দেখুন, প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলুন, তাদের উইচ্যাট (WeChat) কিউআর কোড স্ক্যান করুন এবং তাদের গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত হন। সাধারণত কোনো ফি লাগে না অথবা খুবই সামান্য (সেমিস্টার প্রতি ২০ থেকে ৫০ CNY) হতে পারে।
কেন এটি কার্যকর: ক্লাবগুলো আপনাকে এমন মানুষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ করে দেয় যাদের আগ্রহ আপনার মতোই। এই নিয়মিত যোগাযোগই পরিচিতিকে বন্ধুত্বে রূপান্তর করে। বাস্কেটবল ক্লাব বা ফটোগ্রাফি গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে নিখুঁত চাইনিজ বলতে পারার প্রয়োজন নেই।
ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সচেঞ্জ (Language exchange)
এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম কার্যকর একটি সামাজিক কৌশল।
অনেক চীনা শিক্ষার্থী ইংরেজি (বা আপনি যে ভাষাটি জানেন) অনুশীলন করতে চায়। আর আপনি চাইনিজ অনুশীলন করতে চান। ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সচেঞ্জ আপনাদের উভয়কেই উপকৃত করতে পারে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার বা ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। আপনি চাইলে ক্যাম্পাসের উইচ্যাট গ্রুপগুলোতেও ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সচেঞ্জের প্রস্তাব দিয়ে পোস্ট করতে পারেন।
একটি সাধারণ ফরম্যাট হতে পারে: সপ্তাহে একবার বা দুবার দেখা করা, ৩০ মিনিট চাইনিজে কথা বলা এবং ৩০ মিনিট ইংরেজিতে কথা বলা। এই কথোপকথনই বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে। অনেক গভীর আন্তঃসাংস্কৃতিক বন্ধুত্বের শুরু এভাবেই হয়।
আপনার বিভাগ (Department)
মাস্টার্স এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের রিসার্চ গ্রুপ বা বিভাগ হলো স্যোশালি যুক্ত হওয়ার স্বাভাবিক জায়গা। আপনি ল্যাব, সেমিনার এবং কনফারেন্সে একই মানুষদের দেখতে পান। চীনে ল্যাব সংস্কৃতির মধ্যে দলগতভাবে খাবার খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া এবং সুপারভাইজার বা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আয়োজিত উৎসব উদযাপন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
প্রথম কয়েক মাস প্রতিটি আমন্ত্রণ গ্রহণ করুন, এমনকি কোনো অনুষ্ঠান আপনার কাছে কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হলেও। সেখানে উপস্থিত থাকাটা নিখুঁতভাবে সাবলীল থাকার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাম্পাস ইভেন্ট (Campus events)
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি মেলা, স্পোর্টস টুর্নামেন্ট এবং বিভিন্ন উৎসবের (যেমন: মিড-অটাম ফেস্টিভ্যাল, চাইনিজ নিউ ইয়ার, ন্যাশনাল ডে) আয়োজন করে। এগুলো মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য খুব শান্ত একটি পরিবেশ দেয়। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অফিস সাধারণত এই ইভেন্টগুলোর প্রচারণা চালায়।
ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহ
আপনি যদি বিশ্বাসী বা ধার্মিক হন, তবে নিজের জন্য একটি ধর্মীয় কমিউনিটি খুঁজে পাওয়া মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক যোগাযোগের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। চীনে মসজিদ, চার্চ (নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত), বৌদ্ধ এবং তাওবাদী মন্দির এবং অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অফিস বা সহপাঠীরা আপনাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে মনে রাখবেন যে চীনে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় এবং কিছু কার্যক্রম আপনার অভ্যস্ত পরিবেশের তুলনায় কিছুটা সীমাবদ্ধ হতে পারে।
অনলাইন কমিউনিটি
- CGS World টেলিগ্রাম গ্রুপ: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের CSC স্কলারদের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য টেলিগ্রামের CGS World কমিউনিটিতে যোগ দিন। শিক্ষার্থীরা এখানে পরামর্শ শেয়ার করে এবং একে অপরকে সাহায্য করে।
- বিশ্ববিদ্যালয় উইচ্যাট গ্রুপ: আপনার ক্লাস, ডরমিটরির ফ্লোর এবং বিভাগের নিজস্ব উইচ্যাট গ্রুপ থাকে। সেগুলোতে সক্রিয় থাকুন।
- Xiaohongshu (RED): আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের খোঁজ করুন। অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের জীবন এবং ইভেন্ট নিয়ে এখানে পোস্ট করে।
চীনা শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুত্ব বৃদ্ধি করা
স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য চীনা সামাজিক সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু বিষয় বোঝা জরুরি:
১. বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে: প্রথম দেখাতেই খুব গভীর কথোপকথনের আশা করবেন না। চীনা সামাজিক সম্পর্কগুলো প্রায়ই দলগত কাজ, একসাথে খাবার খাওয়া বা ছোটখাটো সাহায্যের মাধ্যমে শুরু হয় এবং তারপর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে রূপ নেয়। এখানে ধৈর্যের প্রয়োজন।
২. দলগত কাজের গুরুত্ব: চীনে সামাজিক জীবন প্রায়ই দলগত হয়। আপনাকে ডিনার, পার্কে ঘুরতে যাওয়া বা কেনাকাটার জন্য একটি দলের সাথে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। আপনি যদি একা দেখা করতে পছন্দও করেন, তবুও এই দলগত আমন্ত্রণগুলো গ্রহণ করুন। দলের মধ্যেই ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
৩. খাবার খাওয়া একটি সামাজিক অনুষ্ঠান: চীনে একসাথে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক গভীর হয়। কেউ যদি আপনাকে একসাথে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, তবে সেটি একটি ইতিবাচক সংকেত। আপনি যদি কারো সাথে বন্ধুত্ব শক্তিশালী করতে চান, তবে তাকে লাঞ্চ বা ডিনারের দাওয়াত দিন। বন্ধুর খাবারের বিল দেওয়া (অথবা বিল দেওয়ার জন্য আদুরে ঝগড়া করা, যা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য) মহানুভবতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
৪. উইচ্যাট (WeChat) হলো বন্ধুত্বের ভিত্তি: চীনে কাউকে উইচ্যাটে যুক্ত করা মানে ফোন নম্বর আদান প্রদানের সমান, তবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। একবার উইচ্যাটে বন্ধু হয়ে গেলে আপনারা একে অপরকে মেসেজ দিতে পারেন এবং ‘Moments’ (সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট) শেয়ার করতে পারেন। মাঝেমধ্যে মেসেজ দিন এবং তাদের পোস্টে রিয়েক্ট করে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখুন।
৫. ভাষা শেখার চেষ্টা: মৌলিক চাইনিজ বাক্য বলার চেষ্টা করাও স্থানীয়দের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। “谢谢” (ধন্যবাদ) বা “你好” (হ্যালো) বলা অনেক সম্মান বয়ে আনে। আপনার এই চেষ্টা চাইনিজরা খুব পছন্দ করে।
সাধারণ সামাজিক ভুলগুলো এড়িয়ে চলা
শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের গণ্ডি (bubble)-র মধ্যে থাকা: এটি আরামদায়ক হলেও, আপনি যদি শুধু বিদেশীদের সাথেই সময় কাটান, তবে দীর্ঘমেয়াদে আপনার নেটওয়ার্ক সীমিত হয়ে পড়বে এবং আপনি যে সংস্কৃতির জন্য এসেছেন সেটি উপভোগ করতে পারবেন না।
চীনা শিক্ষার্থীরা যেচে আপনার সাথে কথা বলবে এমনটা আশা করা: কেউ কেউ হয়তো বলবে, কিন্তু অনেকেই বলবে না। লাজুকতা, ভাষা নিয়ে সংকোচ এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে প্রায়ই আপনার নিজেকেই আগে কথা বলতে হবে।
চীনাদের সামনে চীনের সমালোচনা করা: সহপাঠী আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করা স্বাভাবিক, কিন্তু চীনা পরিচিতদের সামনে চীনের সংস্কৃতি, খাবার বা সরকারি ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করা সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। আপনার ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং সামাজিক মেলামেশাকে আলাদা রাখুন।
দলগত পরিকল্পনা নিয়ে অধৈর্য হওয়া: চীনাদের দলগত পরিকল্পনায় কোথায় যাওয়া হবে বা কখন যাওয়া হবে তা নিয়ে উইচ্যাট গ্রুপে অনেক আলোচনা হয়। কোনো সিদ্ধান্ত এখানে সবার মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার সাথে মানিয়ে নিন।
‘ফেস’ (face) বা সম্মানের বিষয়টি খেয়াল রাখা: চীনে ‘ফেস’ (面子) বা জনসমক্ষে কারো সম্মান বা মর্যাদা রক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবার সামনে চীনা বন্ধুর ইংরেজি ভুল শুধরে দেবেন না বা কাউকে এমন কোনো মতামত দিতে বাধ্য করবেন না যা তিনি গোপন রাখতে চান। সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে এবং কৌশলে কথা বলুন।
সামাজিক কাজ যা ভালো ফলাফল দেয়
একসাথে রান্না করা: আপনার ডরমিটরিতে এমন একটি রাতের আয়োজন করতে পারেন যেখানে আপনি আপনার দেশের রান্না করবেন এবং আপনার চীনা বন্ধুরা স্থানীয় খাবার রান্না করবে। খাবারের আদান প্রদান সবাই পছন্দ করে।